গরু মোটাতাজাকরণ ও তার আনুমানিক লাভ ক্ষতি 

গরুর খামার

গরু মোটাতাজাকরণ

আমাদের দেশে বর্তমানে গবাদিপশু থেকে যে পরিমাণ দুধ ও মাংস পাওয়া যায় তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। অন্যদিকে এদেশে বেশিরভাগ গরুর জাত অনুন্নত এবং হাড্ডিসার হওয়ার কারণে এদের থেকে মাংস কম পাওয়া যায়। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার মাংসের চাহিদা পূরণের জন্য বিশেষ পদ্ধতিতে গরুর যত্ন নিতে হবে। খুব কম সময়ে অল্প পুঁজি খাটিয়ে গরু মোটাতাজা করে ভালো লাভ করা যায়। এ পদ্ধতিতে ৩-৪ মাস সময়ের মধ্যে লাভসহ মূলধন ফেরত পাওয়া যায়। বেশি পরিমাণে মাংস উৎপাদনের জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থাপনায় খাবার খাইয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গরু পালন করাকে গরু মোটাতাজাকরণ বলে। এই পদ্ধতিতে পরিকল্পিতভাবে খাদ্য খাওয়ানোর মাধ্যমে গরুর দেহের মাংস ও চর্বি বৃদ্ধি করে বাজারজাত করা হয়। দেশের মাংসের ঘাটতি পূরণ ও বর্ধিত জনসংখ্যার কাজের ব্যবস্থা করতে বাণিজ্যিকভাবে গরু মোটাতাজাকরণ ব্যবসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং লাভজনক।

গরু মোটাতাজাকরণের সুবিধা

১. কম টাকা বিনিয়োগ করে অল্প সময়ে লাভসহ মূলধন ফেরত পাওয়া যায়।

২. দেশী এবং শংকর দুই জাতের গরুই মোটাতাজাকরণে ব্যবহার করা যায়।

৩. গরুর খামার তৈরির জন্য খুব বেশি শ্রমিক এবং দক্ষ অভিজ্ঞ শ্রমিকেরও প্রয়োজন হয় না।

৪. এ ধরণের খামারের জন্য বেশি জমিরও প্রয়োজন হয় না।

বাজার সম্ভাবনা

বাজারে যে সময় গরুর দাম কম থাকে সেসময়ে গরু ক্রয় করে যখন দাম বাড়ে তখন বিক্রি করলে লাভবান হওয়া যায়। কোরবানী ঈদের সময় গরুর দাম বেশি থাকে। তাছাড়া বর্তমানে সারাবছরই মাংসের বাজার দর স্থিতিশীল থাকায় গরু মোটাতাজাকরণ ব্যবসার সাথে জড়িত থাকলে লাভবান হওয়া যায়। স্থানীয় হাট-বাজার ও শহরে গরুর মাংসের চাহিদা খুব বেশি। গরুর দুধ প্রতিবেশিদের কাছে এবং বাজারে বিক্রি করা যায়।গরু মোটাতাজাকরণের পদ্ধতি

গরু মোটাতাজাকরণের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে, যেমন-

১. স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান নির্মাণ

২. উপযুক্ত জাত ও ধরণ অনুসারে গরু নির্বাচন ও ক্রয়

৩. সুষম খাদ্য সরবরাহ

৪. রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান নির্মাণ

১. মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়ায় গরুকে বেঁধে পালতে হবে।২. আলো বাতাস যুক্ত উঁচু জায়গায় গরুর ঘর তৈরি করতে হবে। চারদিক খোলামেলা রাখতে হবে যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে।৩. গোয়াল ঘরের পূর্বদিকে রোদ ঢোকার এবং দক্ষিণ দিকে বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা করতে হবে। গোয়াল ঘরের উত্তর দিকে বেড়া দিয়ে রাখতে হবে, যেন শীতকালে উত্তরের বাতাস না ঢোকে।

৪. প্রতিটি গরুর জন্য ৩-৪ বর্গমিটার (৭ ফুট X ৫ ফুট) জায়গা হিসেবে ঘর তৈরি করতে হবে।

৫. ঘরের মেঝে ইট বিছানো বা পাকা হতে পারে তবে মসৃণ করা যাবে না। কাঁচা মেঝেতেও গরু পালন করা যায়। ঘরের মেঝের একদিকে ঢালু করতে হবে যাতে গোবর চনা ড্রেন দিয়ে দূরে গর্তে ফেলা যায়।

৬. কাঠ বা বাঁশের খুঁটি দিয়ে ঘর তৈরি করতে হবে।

৭. ঘরের চালা টিন বা শন দিয়ে তৈরি করতে হবে। গরমের সময় চালা যেন বেশি উত্তপ্ত না হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। টিনের চালা হলে চালার নিচে বাঁশের তৈরি চাটাই দিতে হবে।

৮. নিয়মিত ঘর পরিষ্কার পরিছন্ন রাখতে হবে এবং স্বাস্থ্যসম্মত পালন ব্যবস্থা মেনে চলতে হবে।

উপযুক্ত জাত ও ধরণ অনুসারে গরু নির্বাচন ও ক্রয়

গরু মোটাতাজাকরণের সবচেয়ে প্রধান কাজ হলো কম দামে ভালো গরু কেনা। গরু বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নিচের বিষয়গুলোর দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে :

১. সাধারণত: দেড় থেকে দু’বছর বয়সের এঁড়ে বাছুর অথবা প্রজননের অনুপযুক্ত ষাঁড়, বকনা বা গাভী, নির্বাচন করতে হবে।

২. বিশুদ্ধ জাতের গরু অপেক্ষা শংকর জাতের গরুর শারীরিক বৃদ্ধি তাড়াতাড়ি হয় বলে শংকর জাতের গরু নির্বাচন করা ভালো।

৩. গরুর শিং দেখে সহজে বয়স চেনা যায়। এক বছর বয়স হওয়ার পর থেকে প্রতি বছর গরুর শিং-এ একটি গোল দাগ বা রিং পড়ে। গরুর বয়স যে কয় বছর হয় শিং-এ সে কয়টি গোল দাগ পড়ে। এছাড়া গরুর দাঁত দেখেও বয়স আন্দাজ করা যায়। সাধারণত দুই বছর বয়সে দুটি স্থায়ী দাঁত উঠে। এরপর প্রতি নয় মাস পর একজোড়া করে স্থায়ী দাঁত উঠে।

৪. রোগা-পাতলা, গায়ের চামড়া ঢিলা, গলকম্বল বড় ও ঝুলানো এমন গরু নির্বাচন করতে হবে।

৫. মাথা ও পা খাটো, মোটা এবং সুগঠিত গিরা এমন গরু নির্বাচন করতে হবে।

৬. বাড়ন্ত আকার, পিঠ সোজা, গোলাকৃতি গলা, চওড়া ও ভরাট বুক, প্রশস্ত পাঁজড়, দৃড় উজ্জ্বল ও ভেজা চোখ বিশিষ্ট পাতলা অথচ সুস্থ রোগহীন গরু বাছাই করতে হবে।

৭. কালো ও গাঢ় লাল রঙের গরু বাছাই করতে হবে। এতে বাজারে ভালো দাম পাওয়া যাবে|

সুষম খাদ্য সরবরাহগরুর ওজন অনুযায়ী সুষম খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। গাভীর জন্য পরিমাণমত সবুজ ঘাস, খড় ইত্যাদি আঁশযুক্ত খাবার দিতে হবে। তাছাড়া দানাদার খাবারও দেওয়া যায়। বাছুরকে শুধু দানাদার খাবার (গম ভাঙ্গা, খেসারির ডালের গুড়া ইত্যাদি) দেওয়া ভালো।* দানাদার খাদ্য মিশ্রণ

নিচে মোটাতাজাকরণের গরুর জন্য একটি দানাদার খাদ্য মিশ্রণের তালিকা দেওয়া হলো
উপাদান শতকরা হার এককেজি দানার খাদ্য মিশ্রণের পরিমাণ
গমের ভুশি ২৫% ২৫০ গ্রাম
চালের কুড়া ২৫% ২৫০ গ্রাম
তিলের খৈল ২০% ২০০ গ্রাম
যে কোন কালাই বা ছোলা ২০% ২০০ গ্রাম
হাড়ের গুড়া/ঝিনুক গুড়া/ চুন ৫% ৫০ গ্রাম
লবণ ৫% ৫০ গ্রাম
মোট ১০০% ১০০০ গ্রাম =১ কেজি

তথ্য সূত্র: গরু মোটাতাজাকরণ, মে ২০০৩, স্মল এন্টারপ্রাইজ ইউনিট, আইটিডিজি-বাংলাদেশ, ঢাকা।

রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

লাভজনকভাবে গরু মোটাতাজাকরণের জন্য প্রয়োজন গরুর সঠিক পরিচর্যা, পরিষ্কার-পরিছন্নতা, নিয়মিত টিকাদান ও চিকিৎসা। এক্ষেত্রে নিচের বিষয়গুলোর দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে:

১. কেনার পর গরুকে ৭ দিন আলাদা রাখতে হবে।

২. স্বাভাবিক অবস্থায় আসার পর গরুকে কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়াতে হবে।

৩. গরুর থাকার জায়গা সবসময় পরিষ্কার-পরিছন্ন এবং শুকনা রাখতে হবে।

৪. গরুকে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে সঠিক পরিমাণে সুষম খাদ্য দিতে হবে।

৫. রোগ-ব্যাধি দেখা দিলে সাথে সাথে ডাক্তারের পরামর্শ মতো চিকিৎসা দিতে হবে।

৬. রোগে আক্রান্ত গরুকে অবশ্যই আলাদা করে চিকিৎসা দিতে হবে।

আনুমানিক আয়-ব্যয় হিসাব

মূলধন

গরু মোটাতাজাকণের জন্য আনুমানিক ৭০০০০ টাকার প্রয়োজন হবে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ঋণদানকারী ব্যাংক (সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক , রূপালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক) বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান(আশা, গ্রামীণ ব্যাংক, ব্রাক, প্রশিকা)- এক্ষেত্রে সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে থাকে।

* খরচ (দুটি গরুর ১ মাসের খাবার ও চিকিৎসা)

খাদ্য আনুমানিক মূল্য (টাকা)
গমের ভূসি ৭৮০০
চালের কুড়া (১৫০ কেজি) ১৭০০০
তিলের খৈল (১৫ কেজি) ২৫০
ছোলা (৫০০ গ্রাম) ২০
চুন (১০০ গ্রাম) ১০
লবণ(৮ কেজি) ১৬০
ঔষধ ও ডাক্তার ২৫০
লালী গুড় (১০ কেজি) ৩০০
মোট=১০৪৯০

৬ মাসে দুটি গরুর ক্ষেত্রে খরচ হয় ৬´১০৪৮৯০=৬২,৯৪০ টাকা।

* আয়

গরু মোটাতাজাকরণের পর ১টি গরু প্রায় ৩৫০০০-৪০০০০ টাকায় বিক্রি করা যায়।সেক্ষেত্রে দুটি গরু বিক্রি করে প্রায় ৭০০০০-৮০০০০ টাকা পাওয়া যায়।

* লাভ
দুটি গরু বিক্রি বাবদ আয় ৭০০০০ টাকা ৭০০০০ টাকা
দুটি গ্ররু মোটাতাজাকরণ বাবদ ব্যয় ৬২৯৪০ টাকা ৬২৯৪০ টাকা
লাভ=৭০৬০ টাকা গরু বিক্রির দামের উপর নির্ভর করে লাভ কম বা বেশি হতে পারে।

প্রশিক্ষণ

গরু মোটাতাজাকরণের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে অভিজ্ঞ কারো কাছ থেকে এ পদ্ধতির বিস্তারিত জেনে নিতে হবে। এছাড়া গরু মোটাতাজাকরণ সংক্রান্ত কোন তথ্য জানতে হলে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা অথবা উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করা যেতে পারে। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা উপজেলা পর্যায়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্ধারিত ফি এর বিনিময়ে পশু পালন বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।

গরুর মাংস ও দুধ প্রাণীজ আমিষের অন্যতম উৎস। সারাবছরই গরুর মাংস ও দুধের চাহিদা থাকায় গরু মোটাতাজাকরণ ব্যবসা করলে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

প্রশ্ন ১ : কোন ধরণের গরু মোটাতাজাকরণের জন্য উপযোগী ?

উত্তর : দেশী এবং শংকর দুই ধরণের গরুই মোটাতাজাকরণের ব্যবস্থা করা যায়। তবে শংকর জাতের গরু বেশি উপযোগী।

প্রশ্ন ২ : গরু মোটাতাজাকরণের জন্য কোন ধরণের খাবার দিতে হয় ?

উত্তর : সুষম এবং দানাদার খাবার।

প্রশ্ন ৩ : গরু মোটাতাজাকরণ ব্যবসায় কি লাভজনক ?

উত্তর : হ্যাঁ, কারণ সারাবছরই গরুর মাংস ও দুধের চাহিদা থাকে।

The following two tabs change content below.

Habib Hafiz

সংক্ষিপ্ত বররনা সময় করে লিখতে হবে।

About the author: Habib Hafiz

সংক্ষিপ্ত বররনা সময় করে লিখতে হবে।